Header Ads Widget

Responsive Advertisement

কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবায় ‘অনন্য’ উদ্যোগ

 


সকাল ১০টা। দুজন চিকিৎসক একটি নির্দিষ্ট কক্ষে বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের ওজন মাপা থেকে শুরু করে তাদের শারীরিক সমস্যার কথা আলাদা করে শুনছেন। প্রয়োজনে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন। এতে কোনো ছাত্রীর মাসিক-পরবর্তী সমস্যা, কোনো ছাত্রের চোখের সমস্যা, কারও বেশিক্ষণ বসে থাকলে কোমরে ব্যথা হওয়ার মতো সমস্যা উঠে আসে। চিকিৎসকেরা প্রত্যেককে এসব সমস্যা সমাধানে নানা পরামর্শ দেন।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর চাঁদপুরের বাগাদী গণি উচ্চবিদ্যালয়ে এমন দৃশ্য দেখা যায়। এই বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিকক্ষের পাশে কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা কর্নার স্থাপন করা হয়েছে। সপ্তাহে এক দিন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য সহকারীরা বিদ্যালয়টিতে যান। তাঁরা কর্নারে কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যগত খোঁজখবর নেন। তাদের স্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষা দেন।

শুধু এই বিদ্যালয়েই নয়, চাঁদপুর সদর উপজেলার মাধ্যমিক পর্যায়ের ২৫টি স্কুল-মাদ্রাসা ও ৪৪টি কমিউনিটি ক্লিনিকে বর্তমানে এ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে।


 

২০১৯ সালে চাঁদপুর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সাজেদা বেগম এ কার্যক্রম শুরু করেন। কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক-মানসিক সুস্থতা নিশ্চিতে সাজেদার উদ্যোগকে ‘অনন্য’ বলছেন চিকিৎসক, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা।

সরকারি উদ্যোগে সারা দেশে এই কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় পুষ্টি সেবা প্রতিষ্ঠানের লাইন ডিরেক্টর এস এম মোস্তাফিজুর রহমান।

যেভাবে শুরু

৯ বছর আগে চাঁদপুর সদরের বাগাদী ইউনিয়নে সহকারী সার্জন হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন সাজেদা। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষা দেওয়া ছিল তাঁর পছন্দের কাজ।

বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েদের মাসিক শুরু হয়। ছেলেদের হরমোনজনিত শারীরিক পরিবর্তন দেখা দেয়। এ সময় তাদের শরীর ও মনের বাড়তি যত্ন দরকার। কিশোর-কিশোরীদের এই প্রয়োজন বিশেষভাবে অনুভব করেন সাজেদা।

২০১৯ সালে সাজেদা বেগম চাঁদপুর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কর্মকর্তা হয়ে আসেন। এরপর তিনি চাঁদপুর সদরে কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যশিক্ষা ছড়িয়ে দিতে উদ্যোগী হন। তিনি উপজেলার স্কুল, মাদ্রাসা ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে কৈশোরবান্ধব করার উদ্যোগ নেন।

একই বছরের ২৯ ডিসেম্বর বাগাদী ইউনিয়নের বাগাদী গণি উচ্চবিদ্যালয়, বাগাদী আহম্মদিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা ও বাগাদী কমিউনিটি ক্লিনিকে কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা কর্নার চালু করেন সাজেদা।

উদ্যোগটি সম্পর্কে সাজেদা প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রথমে আমি ব্যক্তিগতভাবে তিনটি প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা কর্নারগুলোকে সুসজ্জিত করে কার্যক্রম শুরু করি। পরবর্তীতে উপজেলা ও জেলা প্রশাসন এই কার্যক্রমে সহায়তা করে।’

বাগাদী গণি উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারিয়া আক্তার বলে, ‘সুষম খাদ্য, পুষ্টি ও মাসিকের স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ে আগে আমরা তেমন কিছুই জানতাম না। আমাদের স্কুলে ডাক্তার ম্যাডাম এসে অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়েছেন।’

অন্য প্রতিষ্ঠানেও চালু

বাগাদী ইউনিয়নের দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও একটি কমিউনিটি ক্লিনিকে কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিষয়ক শিক্ষা দেওয়ার বিষয়টি একপর্যায়ে সাড়া ফেলে। উপজেলার অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও একই ধরনের কার্যক্রম গ্রহণের ব্যাপারে আগ্রহ তৈরি হয়।


 

সাজেদা বলেন, তখনকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কানিজ ফাতেমা, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কামাল হোসেন, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম দেওয়ানসহ অনেকে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। তাঁরা উপজেলার অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও এই কার্যক্রম শুরু করতে তাঁকে অনুরোধ করেন। পরবর্তী সময়ে চাঁদপুর সদরের ১৪টি ইউনিয়নের মোট ২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ কার্যক্রম চালু করা হয়।

সাজেদা এখন চাঁদপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত। বর্তমানে স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা কর্নার কার্যক্রমের তদারকি করছেন চাঁদপুর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন।

বেলায়েত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন ইউনিয়নের স্কুল, মাদ্রাসা ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসক-স্বাস্থ্য সহকারীদের রোস্টার করে (পালাক্রমে) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁরা সপ্তাহে এক দিন স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা কর্নারে গিয়ে কিশোর-কিশোরীদের সমস্যাগুলো শোনেন, প্রাথমিক সমাধান দেন। তবে চিকিৎসক–সংকট থাকায় কিছু সমস্যা হচ্ছে।

ছাত্রীদের উপস্থিতি বেড়েছে

স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা কর্নার চালুর ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বেড়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ে ছাত্রীদের অনুপস্থিতির হার কমে গেছে বলে জানান শিক্ষকেরা।

বাগাদী আহম্মদিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আবু আবদুল্লাহ মোহাম্মদ খান বলেন, কর্নার চালু হওয়ায় শিক্ষার্থীরা নিজেদের শারীরিক-মানসিক বিভিন্ন বিষয়ে সঠিক তথ্য জানতে পারছে। তারা এখন অনেক সচেতন। শুধু তা-ই নয়, এখন শ্রেণিকক্ষে ছাত্রীদের উপস্থিতির হার বেড়ে গেছে।

চাঁদপুর শহরের বাবুরহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোশারফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এই কার্যক্রমের ফলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক-মানসিক বিষয়ে যত্নের ব্যাপারে তাঁরা নিজেরাও সচেতন হয়েছেন।

সাজেদার উদ্যোগটির সঙ্গে শুরু থেকেই পরিচিত চাঁদপুর সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কামাল হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, চিকিৎসকেরা প্রতি সপ্তাহে বিদ্যালয়ে যান। তাঁরা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে ব্যবস্থাপত্র দেন। কিশোর-কিশোরীরা বয়ঃসন্ধিকালের শারীরিক-মানসিক পরিবর্তনের নানা বিষয়ে নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বসেই পরামর্শ ও সেবা পাচ্ছে। এতে তারা উপকৃত হচ্ছে।

করোনাকালে অনলাইনে সাড়া

করোনাভাইরাস মহামারির কারণে ২০২০ সালের এপ্রিলে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় উপজেলার ৪৪টি কমিউনিটি ক্লিনিকে স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা কর্নার করে কার্যক্রম জোরদার করা হয়। একই সঙ্গে সাজেদা ‘কৈশোর-বান্ধব উপজেলা, চাঁদপুর সদর’ নামে ফেসবুক পেজের মাধ্যমে কৈশোরবান্ধব কার্যক্রম শুরু করেন।

অনলাইনে স্বাস্থ্যবিষয়ক এই কার্যক্রমের পাশাপাশি দেশাত্মবোধক গান, নাচ ও কবিতা আবৃত্তির আয়োজন করা হয়। এসব কার্যক্রমে উপজেলার বাইরের কিশোর-কিশোরীরাও অংশ নেয়। তাদের পুরস্কৃত করা হয়।

সাজেদা বলেন, সদর উপজেলায় ৮২ হাজার কিশোর-কিশোরী আছে। পিছিয়ে পড়া এলাকাতেই মূলত এই কার্যক্রম বেশি পরিচালনা করা হচ্ছে। কোনো না কোনোভাবে ৬০ হাজার কিশোর-কিশোরী কৈশোরকালীন স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে জানতে পেরেছে বলে তাঁর ধারণা।

চাঁদপুর শহরের বাসিন্দা সোমা শারমিন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর বড় মেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। ছোট মেয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে। করোনাকালে ঘরে থেকে থেকে তাদের একঘেয়েমি পেয়ে বসেছিল। পরে তারা সাজেদার অনলাইন কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তারা স্বাস্থ্যসচেতন হয়। পাশাপাশি সৃজনশীলতা চর্চার সুযোগ পায়।

সারা দেশে ‘চাঁদপুর মডেল’ চালুর পরিকল্পনা

সাজেদার চালু করা কর্মসূচিকে ‘ইনোভেশন’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন উপজেলায় কৈশোরবান্ধব এই মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে।

কুমিল্লার লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নাজিয়া বিনতে আলম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা ১৪টি স্কুলে হেলথ (স্বাস্থ্য) ক্লাব করেছেন। এই ক্লাবে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যশিক্ষা দেওয়া হয়। এ ছাড়া দুটি স্কুলে মাসিকের স্বাস্থ্যবিধি কর্নার করা হয়েছে। এই কর্নার কার্যক্রমে নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি এনজিও সহযোগিতা করেছে।

শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান জানান, চাঁদপুর মডেলের মতো করে তাঁরা এক বছর ধরে স্কুলগুলোতে গিয়ে কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষা দিচ্ছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় পুষ্টি সেবা প্রতিষ্ঠানের লাইন ডিরেক্টর এস এম মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এটি খুব ভালো উদ্যোগ। সাজেদার এই কার্যক্রম দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার।

মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসাগুলোতে কিশোরীদের আয়রন, ফলিক ট্যাবলেট দেওয়া হচ্ছে। কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিয়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। কৈশোরবান্ধব এই কার্যক্রমকে আরও সমন্বিত ও কার্যকর করা হবে।

 

 

 

 

Post a Comment

0 Comments