রংপুর অঞ্চলে সংরক্ষিত ১০ হাজার ইভিএমের মধ্যে অধিকাংশই ত্রুটিপূর্ণ। এর মধ্যে কোনোটির হারিয়েছে যন্ত্রাংশ, কোনটি কেটেছে উইপোকায়, আবার কোনটি ভাঙা হয়েছে পিটিয়ে। রংপুর সিটি কর্পোরেশন (রসিক) নির্বাচনে ব্যবহারের জন্য সেই অঞ্চলে সংরক্ষিত ১০ হাজার ৭৫৯টি ইভিএমের মধ্যে ৬ হাজার ৩৫টিতেই ধরা পড়ে ত্রুটি। এছাড়া ১ হাজার ১২৩টি ইভিএমের মধ্যে কোনোটির যন্ত্রাংশ চুরি গেছে, আবার কোনোটির হদিসই নেই। স্পর্শকাতর ইভিএমের যন্ত্রপাতির অধিকাংশই অযত্ন আর অবহেলায় অকেজো হয়ে গেছে। অধিকাংশ ইভিএমের প্যাকেট কেটে উইপোকা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে সব যন্ত্রপাতি।
রসিক নির্বাচনকে সামনে রেখে গত সেপ্টেম্বরের শেষে ইভিএমগুলো যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে এই ত্রুটি। ইভিএম পর্যবেক্ষণ শেষে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে ত্রুটির বিষয়গুলো জানান প্রকল্প কর্মকর্তারা। দেশের বিভিন্ন স্থানে মজুদ করা ইভিএমগুলো দ্রুত সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে অতি স্পর্শকাতর এই ইভিএম সংরক্ষণে আরো ৮ দফা সুপারিশ জানানো হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারাদেশে খোঁজ নিলে হয়তো আরও অনেক ইভিএমে ত্রুটি দেখা যেতে পারে। ইভিএম সংরক্ষণে আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল নির্বাচন কমিশনের। দক্ষ লোক না থাকায় ইভিএমের এবারের ত্রুটি সারিয়ে নিয়ে ভবিষ্যতে যাতে এমনটি না ঘটে সে বিষয়ে দৃষ্টি রাখার জন্য পরামর্শ দেন তারা। সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক অধ্যাপক ড. বদিউল আলম মজুমদার ঢাকা টাইমসকে বলেন, সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা এবং জলবায়ুর আদ্রতার ফলেই মরিচা কিংবা ফাঙ্গাস পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে মেশিনগুলো।
ইভিএম একটি নিকৃষ্ট ও দুর্বল মেশিন দাবি করে সুজন সম্পাদক বলেন, ‘এটি যে নির্ভরযোগ্য এবং ভোটগ্রহণের জন্য উপযোগী নয় তা আবারও প্রমাণ হয়েছে।’
অবহেলায় ইভিএম নষ্ট হওয়ার বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন ঢাকা টাইমসকে জানান, ইভিএমগুলো তো এমন স্থানে সংরক্ষণ করা উচিত ছিল যেখানে রাখলে ফাঙ্গাস পড়বে না। নিশ্চয়ই ইসির প্রপার সংরক্ষণের জায়গা নেই। তাছাড়া ইভিএমগুলো সংরক্ষণ করা যাদের দায়িত্ব ছিল তাদের টেকনিক্যাল ধারণা কম থাকায় এমনটি ঘটেছে। ভেঙে যাওয়া কিংবা যন্ত্রাংশ চুরি যাওয়ার বিষয়ে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, নির্বাচন শেষে হয়তো উঠানামার সময়ে ভেঙে যাওয়া কিংবা হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।
নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর নির্বাচন কমিশনের কি কি মালামাল আছে তা ভালো করে বুঝে নেওয়া উচিত ছিল জানিয়ে সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, নতুন কমিশনের উচিত ছিল আগে সার্ভে করা। পরে ইভিএমে ভোটগ্রহণ করা। এটা তো শুধু রংপুরের ঘটনা সারাদেশে খোঁজ নিলে এমন হয়তো আরও অনেক ত্রুটিযুক্ত ইভিএম পাওয়া যাবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ ঢাকা টাইমসকে বলেন, ইভিএম সংরক্ষণে অবহেলা হয়েছে কিনা খতিয়ে দেখা দরকার। যদি ভালোভাবে সংরক্ষণের অভাবে ইভিএমগুলো নষ্ট হয়ে থাকে তাহলে দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এমন ঘটনা গ্রহণযোগ্য নয় জানিয়ে সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘এ যাত্রায় হয়তো অল্পের ওপর দিয়ে গেছে। তবে ভবিষ্যতে যাতে একটি ইভিএমও ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখবে নির্বাচন কমিশন।’
ইভিএম সংরক্ষণে রাখার জন্য ইসির গোডাউনে স্বল্পতা রয়েছে ভবিষ্যতে বিষয়টি আমলে নেবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
রসিক নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক আবদুল বাতেন ঢাকা টাইমসকে জানান, ইভিএমে ত্রুটির বিষয়টি আমিও শুনেছি তবে এখনও বিস্তারিত জানি না। আর রসিক নির্বাচনে ভোটগ্রহণের জন্য আমি এখনও ইসিতে ইভিএম চাইনি। মাত্র তফসিল ঘোষণা হয়েছে ডিসেম্বরের ২০ তারিখ নাগাদ হয়তো আমি নির্বাচন কমিশনে ইভিএম চাইব।
২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ১ লাখ ৫০ হাজার ইভিএম কেনে নির্বাচন কমিশন। বিভিন্ন নির্বাচনে সেগুলো ব্যবহারের পর তা সংরক্ষণ করা হয় সারাদেশের ইসির আঞ্চলিক অফিসগুলোতে। রিপেয়ার করার আগে আর ব্যবহার করা যাবে না সেসব যন্ত্র। ফলে আগামী ২৭ ডিসেম্বর রংপুর সিটি নির্বাচনে ভোট করতে নতুন করে ঢাকা থেকে পাঠানো হচ্ছে ইভিএম।
উল্লেখ্য, আগামী ২৭ ডিসেম্বর রংপুর সিটি করপোরেশন ভোটগ্রহণের দিন ধার্য করে তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। যাতে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ২৯ নভেম্বর। মনোনয়নপত্র বাছাই করা হবে ১ ডিসেম্বর। আর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ৮ ডিসেম্বর। প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে ৯ ডিসেম্বর। প্রার্থীরা ১৭ দিন প্রচার-প্রচারণার সুযোগ পাবেন। ৩৩টি সাধারণ ওয়ার্ড এবং ১১টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ২৭ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকালে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। ভোট কেন্দ্রগুলোতে ইভিএম ছাড়াও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে।

0 Comments